জসিম তালুকদার স্টাফ রিপোর্টার (চট্টগ্রাম):

সঘন বৃষ্টিভার নত মৌসুমি বায়ু ইতিমধ্যে ছেয়ে ফেলেছে আকাশ। তারই মাঝে ‘আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহ্বল/ মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে তীরে নারকেল সারি/ বৃষ্টিতে ধূমল;-বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতার নিটোল-সজল-নিবিড় প্রকৃতির লাবণ্য স্নিগ্ধ এক বর্ষাকালের দৃশ্যপটের ভেতর জ্যৈষ্ঠের মধুময় দিনলিপির সমাপন হয়েছে। গত কদিনে ঘনিয়ে আসা মেঘপুঞ্জ আর বৃষ্টির মধুর বিড়ম্বনা জানান দিয়েছে বর্ষার আগমন বার্তা। প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের ‘পিঙ্গল জটা’ ভেদ করে জীমূত-মন্দ্রে বর্ষার কাল নিয়ে এলো আষাঢ়। পঞ্জিকার অনুশাসনে আজ আষাঢ়ের পয়লা দিন। যদিও সাগরের লঘুচাপ আর এক সপ্তাহ আগে দেশে মৌসুমি হাওয়া আগাম প্রবেশ করায় বৃষ্টি হচ্ছে।

প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের রুদ্র দহন ছিন্ন করে বর্ষার দিন এলো। তৃষ্ণাকাতর জগৎ-সংসার এ বর্ষায় ফিরে পায় প্রাণের স্পন্দন। পুরো প্রকৃতি তার রূপ ও বর্ণ বদলে ফেলে। মহাকবি কালিদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহ কাতর যক্ষ মেঘকে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সে বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহ কাতর চিত্তে, যুগ হতে যুগান্তরে। তাই রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন: ‘কবিবর কবে কোন আষাঢ়ের পুণ্য দিবসে লিখেছিলে মেঘদূত।’ বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হৃদয় এক অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ আর কদমফুলের চোখ জুড়ানো শোভা অনুষঙ্গ হয়ে আছে আষাঢ়ের। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। আষাঢ়ে জলভারা বনত ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনো বা ‘প্রাণনাথে’র মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা। বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত মধ্যযুগের কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দে মেঘমেদুর বরষায় শ্যামল বনভূমি আর তমাল তরুছায়াঘন পৃথিবীর নয়ন মনোহর রূপ: মেঘৈর্মে দুরম্বম, বনভুব শ্যামস্তরাল মালদ্রুমৈ…’ ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মন্দাক্রান্তা ছন্দে লেখা ‘যক্ষের নিবেদন’ কবিতায় আছে বর্ষার অসাধারণ অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বরষা এসেছে সামগ্রিক রূপবিভঙ্গে। বর্ষায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাউল হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠত।

রাজধানী ঢাকার এ কদিনের প্রকৃতি রবি ঠাকুরের কবিতা বিমূর্ত হয়ে এঁকে দিয়েছে: ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে…। বর্ষা মানব মনে বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দিলেও হতদরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবনে মহাদুর্যোগ ও দুর্বিপাক বয়ে আনে। এই করোনাকালের দুর্দিনে সেই দুঃখভরা দিন আরও বাড়তে পারে।

সূত্র: ইত্তেফাক

আপনার মতামত লিখুন