সুমন ইসলাম বাবু, লালমনিরহাট

গেল বছর তিস্তার ভাঙন শুরু হয়েছিল আগস্ট মাসে। এবার শুরু হয়েছে আগাম। ভরা বর্ষায় পরিস্থিতি হবে আরো ভয়াবহ- এ নিয়ে তিস্তার দুই তীরের মানুষের শঙ্কা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ওদিকে চলতি জুলাই মাসে নিম্নচাপ ও ভারি বর্ষণজনিত কারণে উজানে পানি বাড়ায় ভারত গজলডোবার তিস্তা ব্যারজের ৪৪টি কপাট খুলে দিয়েছে।

তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনে এবারেও নেমে এসেছে বন্যা ও ভাঙনের দুঃষহ যন্ত্রণা। এবার ভাঙনের কবলে পড়ে তিস্তাপারের সমৃদ্ধ গ্রাম। পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবার ভাটির ৬৫ কিলোমিটার তিস্তা অববাহিকার অবস্থা আর বাংলাদেশের অবস্থা প্রায় একই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজের ভাটির ৬৫ কিলোমিটারের ভোটারদের ভোট প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এবার মমতা চৈত্রমাসেই গজলডোবা ব্যারাজের কপাট খুলে দিয়েছিলেন। ফলে এবার চৈত্র মাসেই গজলডোবার ভাটির তিস্তা জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠে। অসময়ে ওই পানি দেখে অনেকেই আশান্বিত হয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষ কর্তারাতো বেজায় খুশি! তারা এ পানি দেখে ইতোমধ্যে “ঘোড়ার আগেই গাড়ি জোড়ার” পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। কিন্তু তিস্তা পাড়ের চরাঞ্চলের কেউ খুশি হতে পারেননি। অসময়ে উজানের পানি কৃষকের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

ভাটির তিস্তার বুক বালুতে ভরাট থাকায় এবং গভীরতা না থাকায় ওই জল সহসাই ব্রম্মপুত্র-যমুনা হয়ে সাগরে নামতে পারছে না। এক’শ ২২ বছর আগে তিস্তা রেলসেতু তৈরি করেছিল বৃটিশ সরকার। এক’শ বাইশ বছর আগে বাংলাদেশের অংশে বর্ষা মৌসুমে তিস্তা প্রস্থে ছিল দুই কিলোমিটার, শুষ্ক মৌসুমে ১ কিলোমিটার। পাকিস্তান আমলেও ছিল তাই। তিস্তা ১ থেকে ২ কিলোমিটার প্রস্থ থাকলেও সবসময় তখন তিস্তায় পানির বেগ ছিল প্রচুর। গভীর ছিল অনেক। তিস্তার গভীর জলে ছিল নানা জলজপ্রাণী। পানির বেগ আর তীব্র তিস্তার পানি জলদি নেমে যেতো ব্রম্মপূত্রে। ব্রম্মপুত্রের পাানি যমুনা নাম নিয়ে পদ্মা হয়ে সাগরে মিলত। বর্ষাকালে বন্যা হতো সে সময়ও। বন্যা ছিল সেই সময়কালের আশির্বাদ।বন্যার পলিতে নতুন নতুন ফসলি জমি জেগে উঠতো। ফসলি জমি হতো উর্বর। আজকের মতো নির্দয় ভাঙন তিস্তা অববাহিকায় তখন দেখা যায়নি। এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। খরাকালে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশের তিস্তা মরাকাঠে রূপান্তরিত হয়। মাঝি-মাল্লারা বেকার হয়ে পড়ে। তিস্তাকে এখন কেউ বারোমাসি নদী বলেনা। তিস্তা এখন মৌসুমি নদী। নদীর তলদেশ বালুর ঢিপিতে উঁচু। কোথাও কোথাও তিস্তার তলদেশ সমতল ভূমির চেয়েও উঁচু হয়েছে। বর্ষাকালে উজান থেকে পানির ঢল নামলে সে পানি তিস্তা তার বুকে ধরে রাখতে পারে না। বর্ষাকালে তিস্তানদী একটা থাকেনা। তিস্তার মূলনদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিস্তার নানা ঠ্যাং (শাখা-প্রশাখা বেরিয়ে যায় নানাস্থানে। ভয়াবহ হয় বন্যার প্রকোপ ও নদী ভাঙনের। তিস্তার দুইপারের হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়। ওই ভাঙনের জমির মাটি দিয়ে প্রতিবছর তিস্তার তলদেশ ভরাট হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে তিস্তার ভাঙন প্রক্রিয়া’র তান্ডব ভয়ানক বেড়ে গেছে। অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়ে তিস্তা নদীটি প্রস্থে এখন আট থেকে দশ কিলোমিটার হয়েছে। ভাঙনে বিস্তৃত আট-দশ কিলোমিটার প্রস্থ জমি কৃষকের। তিস্তার চরাঞ্চলের জমিকে এখন বলা হয়, “হিডেন ডায়মন্ড”। ভুট্টা, আলু, বাদাম, পিঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ, মিষ্টিকুমড়া, পাটসহ নানা শাকসবজি ফলান কৃষকরা তাদের চরের জমিতে। ইদানিং খরা, বন্যা ও নদী ভাঙনে কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিপর্যয়ের মুখে উত্তরের খাদ্যভান্ডার। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করায় তিস্তাপারের মানুষ মহাখুশি হয়েছিলেন। তারা জানতে পেরেছেন, মহাপরিকল্পনায় তিস্তা নদীর প্রস্থ কমিয়ে মূলনদী কোথাও এক কোথাও দুই কিলোমিটার গভীর খনন করা হবে। করা হবে তিস্তার দুই তীর পাকাপোক্তভাবে সংরক্ষণ। এ কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে ভাঙনকবলিত জমি পুনরুদ্ধার হবে। চীরতরে রোধ হবে নদী ভাঙন। পুনরুদ্ধারকৃত সরকারি জমিতে নানামুখি কর্মসংস্থান গড়ার কথা ছিল ওই মহা-পরিকল্পনায়। কথা ছিল গেল অর্থ বছরেই এর কাজ শুরু করার। যথারীতি এ প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় এবারেও আগাম বন্যা ও ভাঙনের মূখে পড়েছেন তিস্তদাপারের মানুষ। হতাশায় পড়েছেন তারা। তিস্তার ভাঙনে ভুক্তভোগী ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই চরের আমিসা বেগম বলেন,” এই প্রকল্পটা পায়া একটু সুখ, একটু শান্তি যদি দেখি যাইতে পাইতাম তবে হামার কলজাটা শান্তি হইত। একই গ্রামের কৃষক শরিফুল হক বলেন, তিস্তা খোঁড়ানো হয় তা হইলে দুই সাইডে আবাদ করতে পারমো। ভুট্টা, ধান, অসুন, বাদাম, আলু, পিঁয়াজ সব আবাদ করতে পারমো”।

এবারেও তিস্তা অববাহিকার মানুষ আগাম বন্যা ও নির্দয় ভাঙনের বেসামাল পরিস্থিতির কবলে পড়েছেন। বৃষ্টি ও উজানের ঢলের পানি তিস্তার দুই তীরে ছড়িয়ে পড়ছে প্রবলবেগে।পানির তোড়ে তিস্তা তীরবর্তী গ্রামে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। ভাঙন পীড়িত মানুষের কান্না আর আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠছে।সরেজমিনে দেখা দেখা গেছে, ইতোমধ্যেই অসময়ের বন্যার প্রবল ভাঙনে লালমনিরহাট- হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, সিঙ্গামারি,সিন্দুনা, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, কালিগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈলমারী, নোহালী,চর খুনিয়াগাছ ,রাজপুর, গোকুন্ডাহাট, মহিষখোচা ইউনিয়নের কুটিপাড়া, বানপাড়া, বাদিয়াটারি, চৌরাহা ডাইয়াবাড়ি উত্তরের চর, কুড়িগ্রাম- উলিপুর উপজেলার চর বজরা, থেতরাই পাকার মাথা, হোকো ডাঙ্গা, নাগরাকুড়া ,রাজারহাট উপজেলার ঠুটাপাইকর, বিদ্যানন্দ, রংপুর-কাউনিয়া উপজেলার হরিচরণ শর্মা, গণাই, উত্তর বিশ্বনাথ,পীরগাছা উপজেলার শিবদেব, নামা রহমতচর এবং গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশিম বাজার ও চর খোর্দা গ্রামের অসংখ্য পরিবারের বসতভিটা, ঘরদোর, আবাদিজমি, পাকারাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হঠাৎ বন্যার পানিতে চরাঞ্চলের পাট, ভুট্টা, পেঁয়াজ সবজি, বাতাম ফসলের হয়েছে ব্যাপক ক্ষতি। চড়াসুদে ধারদেনা করে ফসল ফলিয়ে ছিলেন। অকাল বন্যা আর ভাঙনে ওদের অনেকের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি সব পাগলা তিস্তা খেয়ে ফেলেছ। ভাঙন কবলিত এলাকাবাসীর দাবি,”আমরা রিলিফ চাইনা, চাই বন্যা ও ভাঙনের স্হায়ী সমাধান। চাই তিস্তা নদী সুরক্ষা-চাই চরাঞ্চলের কৃষির উন্নতি”।

নিজস্ব উদ্যোগে তিস্তাপারে অনেক জায়গায় গণচাঁদা সংগ্রহ করে বাঁশ, বালু দিয়ে শত চেষ্টা করেও মানুষ থামাতে পারছেনা তিস্তার ভাঙন। বাঁশ প্রযুক্তিও কাজে লাগছে না। লাগবে কিভাবে! তিস্তার কি গভীরতা আছে? খরাকালে তিস্তার বুক বালুতে উঁচু হয়ে থাকে। থাকে না পানি প্রবাহ, নাব্যতা। বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চলের কৃষি জমি হয়েছে নিচু-ঢালু। চরাঞ্চলের ঢালু জমিতে তৈরি হয়েছে বালু মহাল। তিস্তার ঢালু জমি থেকে এক্সক্যাভেটর, লোকাল ড্রেজারে বালু ও পাথর উত্তোলনের মহোৎসব চলছে জোরেসোরে।এদের অবৈধ অপকর্মে তিস্তার দুই তীরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যমান বাঁধও পড়েছে ভাঙনের মুখে। এই দানবিক শক্তিকে ঠেকানোর ক্ষমতা চরাঞ্চলের মানুষের নেই। শোষক শ্রেণীর সব দল ও জোট একাজে এক। অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি নানাজাতের কোম্পানি তিস্তার তীর দখল করে, তীর ঘেঁষে নানা স্থাপনা,পর্যটন ও বিদ্যুত কেন্দ্রসহ নানা ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এরা তিস্তার তীর, বুক, তিস্তার শাখা-প্রশাখা নদ-নদীর পানি চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে বাঁধ,পাকারাস্তা নির্মাণ করছে যত্রতত্র। তিস্তার শাখা-প্রশাখা নদীও দখল হয়েছে,হচ্ছে। তিস্তার শাখা-প্রশাখা ও উপশাখাগুলোর সঙ্গে তিস্তা নদীর সংযোগ স্থাপন এবং দখলমুক্ত করা ছাড়া বাঁচার অন্য কোন পথ নেই। বর্ষাকালে উজানের ঢলের পানি দ্রæত ব্রম্মপুত্র-যমুনা দিয়ে সাগরে নামতে পারছে না। তিস্তার শাখা- প্রশাখার পানি চলাচলের প্রবাহমূখ বন্ধ। পানি ছড়িয়ে পড়ে তিস্তার কিনারের গ্রামে।ফলে বর্ষাকালে প্রায় পাঁচমাস তিস্তা অববাহিকার ক্ষেতখামার-ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকে। তিস্তাপারের মানুষের জীবনে এসময় নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও দুর্গতি। নানা পথ দিয়ে পানি চলাচল করবে এটাই পানির ধর্ম। চলাচল শেষে পানি তার গন্তব্য- সাগরে নামবে এটাও সত্য! তিস্তার মূল খাত উঁচু ও ভরাট থাকায়, তিস্তার শাখা- প্রশাখা নদী দখল ও প্রবাহের পথ বন্ধ থাকায় বর্ষাকালে শুধু তিস্তা অববাহিকায় নয়, রংপুর বিভাগের নিম্নাঞ্চল এবং শহরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গেল কয়েক বছর নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, গাইবান্ধাসহ বিভাগের প্রায় প্রতিটি শহর হাঁটু ও বুক পানিতে ঢুবে গিয়েছিল। শহরের মানুষের ঘরেও জমেছিল হাটু পানি। বিভাগীয় শহর রংপুরের বুক দিয়ে ৫টি নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বিদ্যমান। এই প্রবাহের মূল নদ ঘাগট। তিস্তার শাখা ঘাগটের মুখ বন্ধ থাকায় রংপুর শহরের পানি দ্রæত নামতে পারছে না। এরকম দশা দেশের সব শহরেই। অন্যদিকে বন্যার পর গোটা তিস্তা অববাহিকা জুড়ে শুরু হয় নদী ভাঙনের তান্ডব। এই প্রক্রিয়া চলছে রংপুর বিভাগ, উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশেই। তাই, জলবায়ু পরিবর্তনের অশুভ অভিঘাত থেকে বাঁচতে গোটা দেশেই নদী রক্ষার সংগ্রাম জোরদার করা জরুরি। জরুরি অতিলোভী মুনাফাখোর লুটেরা নদী খেকো অপশক্তির হাত থেকে নদী দখলমুক্ত করার সংগ্রামকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এই অপশক্তিকে দমাতে নাপারলে রাজধানীসহ গোটা বাংলাদেশের মানুষ, গোটা দেশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম সবচেয়ে ” বড়” শ্রেণি সংগ্রাম। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার করায় ভাটির বাংলাদেশের বিপদ ক্রমাগত বাড়ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলে সাগরে পড়ছে।সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ছে। করোনার অতিমারির সঙ্গে বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়,জলোচ্ছ¡াস, নদীভাঙন ও বন্যার ভয়াবহ প্রকোপ। বাড়ছে অসহনীয় জলজট।সাগরের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে দক্ষিণাঞ্চলের ১৯ টি উপকুলীয় জেলায়। উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ছে। ক্রমাগত মিঠাপানির সংকট বাড়ছে। জাতিসংঘ বলেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ৩.৫ কোটি মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হবে।এর বাইরেও আছে শঙ্কাজনক খারাপ দিক। বাংলাদেশের একার পক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।এই সমস্যাকে বৈশ্বিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ সর্বোপরি “পৃথিবীকে” রক্ষার সংগ্রামটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে রূপান্তরিত করতে হবে। আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবেনা। আমাদের নিজেদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিজ দেশীয় চেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।এক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য খুবই প্রয়োজন। এই ঐক্যে সমস্ত প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল,শিক্ষক, আইনজীবী, নারীসমাজসহ সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক- পরিবেশবাদী সংগঠন, বিভিন্ন পেশাজীবী, কৃষক-শ্রমিক সংগঠনকে এককাতারে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার ও সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী “তিস্তা নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ হাতে নিয়েছেন। এ প্রকল্প কোন বিদেশী প্রকল্প নয়, এটা জলবায়ু অভিযোজন প্রক্রিয়ার অংশের আমাদের নিজস্ব প্রকল্প।
অগ্রাধিকার দিয়ে ” তিস্তা মহাপরিকল্পনার” ডিজাইন করা হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এর আদলে গোটা দেশের নদী সুরক্ষার কাজ হবে- এটাই আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি। অগ্রাধিকার বিষয়টি এসেছে তিস্তাকে ঘিরেই। আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণে।এখনো গোটাদেশে দশটি জেলার মধ্যে রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলায় দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি, ৪৬ শতাংশ। কুড়িগ্রামে এই হার এখনো ৭১%। রংপুর বিভাগের দুই কোটি মানুষের জন্য আমাদের বরাদ্দ তলানিতে, গড়. ০৯৮ টাকা।করোনার অতিমারিতে চলমান দারিদ্র্যের হার আরো বেড়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে নদী ভাঙন অন্যতম। সবমিলে প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে নদী ভাঙনে।চীনের হেয়াংহোর মতো ” তিস্তার দুঃখ” এখানেই। আমাদের সংবিধানের মূলনীতি অধ্যায়ের ১৯(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতঃ বলা আছে সুষম উন্নয়নের কথা। মানুষে মানুষে সামাজিকও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করার কথা লেখা আছে ওই অধ্যায়ে।

তিস্তার দুঃখ ঘোচাতে, রংপুর বিভাগের বৈষম্য কমাতে হলে ” মহাপরিকল্পনা” বাস্তবায়ন জরুরি। বাংলাদেশ’টা আমরা পেয়েছি বৈষম্য বিরোধী ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সমতা প্রতিষ্ঠায় বৈষম্যে ঘোচানোর লড়াইকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই হাস্যকর! তিস্তা সুরক্ষার লড়াই বৈষম্য বিরোধী সংগ্রামের আলোকবর্তিকা।

তিস্তার তলা গভীর করে খনন, দুই তীরের শক্ত বাঁধন ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।একমাত্র বিকল্প তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার – শীর্ষক “তিস্তা মহাপরিকল্পনার” দ্রæত বাস্তবায়ন।টোটকাটুটকি ওষুধপাতি দিয়ে পাগলা তিস্তাকে থামানো যাবে না। তিস্তার ভাঙনকে যাদু ঘরে পাঠাতে হলে প্রয়োজন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনার” কাজ শুরু করা। সরকারের শীর্ষ কর্তারা ঘোষণা করে বলেছেন, সমীক্ষা শেষ। সব চূড়ান্ত। এই আর্থিক বছরেই কাজ শুরু হবে। আমরা আর চাতক পাখির মতো অপেক্ষার প্রহর গুনতে রাজি নই। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী সুচারুভাবে কাজ হলে তিস্তার মূল চ্যানেলের গভীরতা বাড়বে। দুই তীরের বাঁধন হবে শক্ত।

পদ্মা সেতুর চারপাশের নদী শাসনের আদলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তিস্তাকে শাসন করা হলে ভাঙন ঠেকবে। রক্ষা পাবে তিস্তাতীরের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার ভাঙন কবলিত জনপদ। থামবে ভাঙনপীড়িত মানুষের কান্না। বাঁচবে ” হিডেন ডায়মন্ড খ্যাত” তিস্তা চরের কৃষি ও কৃষক। শিক্ষার ধারা সচল থাকবে চরাঞ্চলের মানুষের সন্তানদের।দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভান্ডার থাকবে অটুট। তিস্তা মহাপরিকল্পাকে ঘিরে সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্ম সংস্থানের সুযোগ। অনেকাংশ লাঘব হবে আঞ্চলিক বৈষম্য। কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে মানুষে মানুষে,অঞ্চলে অঞ্চলে বৈষম্য নিরোধের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। বঙ্গবন্ধু আজীবন ওই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

পাশাপাশি খরাকালে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতেও আমাদের সজাগ থাকতে হবে। তিস্তা আন্তঃদেশীয় নদী। এ নদীর পানির সমান হিস্যা বাংলাদেশের অধিকার। মহাপরিকল্পনা বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞানের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হলে বন্যা ও ভাঙনের হাত থেকে বাঁচবে তিস্তাপারের মানুষ।খরাকালে তিস্তার পানি আমাদের পেতেই হবে। তিস্তা শাসন “তিস্তা চুক্তির” বিকল্প নয়। পরিপূরক।দেশীয় ব্যবস্থাপনায়, আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কারিগরি সহযোগিতায় (পদ্মা সেতুর মতো) তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। তিস্তা সুরক্ষার কাজটিকে কোন অজুহাতেই ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। তিস্তা নদী সুরক্ষায় ” ৬ দফা” দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। তিস্তা নদী তীরবর্তী গ্রামে গ্রামে গঠিত হচ্ছে ” তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও” সংগ্রাম কমিটি। তিস্তাপারের তরুণরা নিজেরাই এলাকায় এলাকায় সংগ্রাম কমিটি গড়ার কাজে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছে। করোনা প্রতিরোধেও তারা নিজ নিজ এলাকায় স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের ঘরে ঘরে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তিস্তার দুইতীরের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী’রা।

তিস্তাতীরের ভাঙনপীড়িত মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে বসে আছে কবে চীনের হোয়াংহ নদীর মতো “তিস্তার” দুঃখ মোচন হবে- সেই আশায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.